বিদ্রোহী পদ্মার পলি বিধৌত প্রাচীন পুন্ড্র জনপদ আমাদের আকরভূমি উত্তরবঙ্গ।
উত্তরবঙ্গ মানে রোদে পোড়া কিষাণের মেহনত,,, ঈষ বিধানো সোনাফলা মটিতে লাঙ্গল ঠেলার হুুউররর...রর হট্ হট্ প্রতিধ্বনি। উত্তরবঙ্গ মানে রাঙ্গা মাটির ধুলিউড়ানো ভাওয়াইয়া গানের গরুর গাড়ি, চৈত্রের বন্দনাগীতি গম্ভীরার গাজন, জোস্নানরাতে মধ্য উঠোনে গায়ে গা ঘেঁসে ফকির গরিবউল্লাহ্-র পুথি শোনা। উত্তরবঙ্গ মানে প্রাচীনত্বের সংষ্কৃতি, প্রকৃতিপ্রীত অাত্তিকরণ, সরল জীবনাচার, ষোলঅানা বাঙ্গালীয়ানা, বৈচিত্র্যময় ষড়ঋতুর সাথে মাটি ও মানুষের নিরন্তর বেঁচে থাকবার সংগ্রাম।
.
উত্তরবঙ্গের সকাল হয় কাক ডাকা ভোরেরও আগে। জীবন জীবিকার অবলম্বন একটুকরো মাটির প্রতি মমত্ববোধ ঘর ছেড়ে মাঠে টেনে আনে আমাদের। মাটির সাথে আমাদের সম্পর্ক অাত্বার চাইতেও অাত্বিক, আপনের চেয়েও আপন। হয়তো মাটির সাথে এই নিগূঢ় বন্ধনের দরুন মাটি কখনোই আমাদের সাথে বেঈমানি করেনা। তিন ফসলী মৃত্তিকা ফুঁড়ে উঠে আসা সোনা রঙ্গের ধান ঠিকই কৃষকের গোলা ভরিয়ে রাখে বছরের পর বছর।
.
নরম পলি-দোআঁশের কাদা গাঁয়ে মেখে বেড়ে ওঠার নিমিত্তে গড়ল - কঠিন - কুটকার্য আজও আমাদের ছুঁতে পারেনি। সহজসরল জীবনদর্শন গুন ও বিনয়ী স্বভাব খুব সহজেই অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে আমাদের। শ্রান্ত দুপুরে আজও বটতলায় জটলা হয়। পাড়ার গাঁয়ের দিঘী খাল কিন্বা নদীতে জটলা করে নাওয়া হয়, আজও ঘর গৃহস্তের গিন্নী রান্নার কাজ সেরে বিলের পথ চেয়ে অপেক্ষা করে গৃহকর্তার জন্য, এখনো কেউ কেউ পান্তা সাজিয়ে বিলের পথ ধরে এগিয়ে যায়। তপ্ত রোদে ধান কাটতে কাটতে কাটতে মায়াময়ী সুরে গান গেয়ে উঠতে দেখা যায় কখনো...
আয়রে ও আয়রে
ভাইরে ও ভাইরে
ভাই বন্ধু চল যাইরে
ও রাম রহিমের বাছা
ও বাঁচা আপন বাঁচা
চলো ধান কাটি আর কাকে ডরি
নিজ খাবার নিজে ভরি, কাস্তেটা শানাই রে....
( হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)
.
দিনের তপ্ত সূর্যটি পশ্চিম আকাশে তেজ কমিয়ে হেলে পড়েলে রাখালরা এখনো গরু খেদিয়ে মাঠে ছোটে, অবাধ্য বালকেরদল হৈ হৈ করে মাঠে নেমে পড়ে, পাড়ার গৃহকর্ত্রীদের মধ্যে গাল গল্পের আসর বসে কোথাও, দক্ষিণমুখি শুভ্র বাতাসের ঝাপটা গায়ে লাগতে থাকে । কর্তারা বাড়িমুখি হবার আগ পর্যন্ত এ আবহের রেশ কাটেনা।
.
সূর্যাস্তের আগে এ জনপদে ব্যাস্ততার ছুটি হয়না। দিনের আলো অল্প থাকতে থাকতে গৃহের মাতাব্বরা বাড়ির পথ ধরেন। রাতের দিশারী হয়ে হ্যারিকেন, পিদিমের আলো আর জ্বলে উঠেনা এখন। তবে বৈদ্যুতিক বাতির হলুদ আলোয় তাকিয়ে এখনো ঢুলুঢুলু চোখে স্বপ্ন দেখা হয় ঠিক। স্বচ্ছলতার স্বপ্ন, ঘুরে দাঁড়াবার স্বপ্ন, নতুন ফসল তোলার স্বপ্ন। রাতের গাঢ় অন্ধকারে ধীরে ধীরে সে স্বপ্ন হয়তো চাঁপা পড়ে যায় অসার ঘুমে। সে ঘুম প্রশান্তির, সে ঘুম নতুন উদ্যোমের......।।
.
ভাল থাকুক উত্তরবঙ্গ, ভাল থাকুক উত্তরের মানুষগুলো।

No comments:
Post a Comment